ভৌতিক গল্প

মধ্যরাতের গল্প||

 

বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। সোহান সাহেব ও তার স্ত্রী লুবনা ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ কিছু শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল লুবনার । ভালো করে কান পেতে শুনতে পেল ওদের দরজার সামনে কেউ কথা বলছে। কয়েকবার সোহান সাহেবকে ডাকলেও ঘুম থেকে উঠলেন না, সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত তিনি। অগত্যা লুবনা নিজেই দরজা খুললো। কিন্তু দরজার সামনে কাউকে দেখতে পেল না। চারপাশে তাকিয়ে বৃষ্টির মাঝে ও দেখলো বাগানের দিকে কেউ একজন হেঁটে যাচ্ছে। ছাতা মাথায় লুবনা বাসা থেকে কে কে বলে বের হয়ে আসলো।

ঘণ্টা দুয়েক পর সোহান সাহেবের ঘুম ভাঙ্গলো। স্ত্রীকে বিছানায় না দেখে বাসা থেকে বের হলেন। ভোর হয়ে আসছে।বৃষ্টি এখন তেমন একটা নেই। বাগানের দিকে গিয়ে দেখলেন তার স্ত্রী লুবনার লাশ আম গাছে ঝুলছে। চোখে স্পষ্ট ভয়ের চিহ্ন। নিজের চোখে যা দেখছেন সেটা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি! কি ভয়ানক বিভৎস অবস্থা! একটা সুতাও নেই লুবনার সারা শরীরে, একদম নগ্ন শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর জায়গাসহ সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত। রক্ত জমাট বেঁধে আছে জায়গায় জায়গায়। প্রানপ্রিয় স্ত্রীর এই করুন দুর্দশা দেখে দিশেহারা অবস্থা উনার। এই বিভৎস মানুষিক অবস্থা সহ্য করা আর সম্ভব হয়ে উঠলো না। তাকিয়ে থাকতে পারলেন না আর, চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে এলো। একটা চিৎকার দিয়েই জ্ঞান হারালেন সোহান সাহেব।

লুবনা হত্যার তিন মাস অতিক্রান্ত হয়েছে অথচ ঘটনার এত দিনেও উদঘাটন হয়নি হত্যা রহস্য। খুনির পরিচয় জানার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামে পুলিশ। এলাকার প্রায় সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াও অন্তত ২০০ লোকের উপর তদন্ত এবং ৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এলাকা শুদ্ধ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোনো কিছুতেই প্রকৃত খুনিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সারা এলাকা চষে বেড়ানোর পরেও আজ পর্যন্ত প্রকৃত খুনি রয়ে গেছে এখনো রহস্যের আড়ালে৷ ঘটনার রহস্য উন্মোচনে পুলিশ, সিআইডি, গোয়েন্দা গ্রুপ সকলের সব অভিযান ব্যর্থ। আরো অনেক অমীমাংসিত কেসের মত আর কিছুদিনের মধ্যে লুবনা হত্যার ফাইলটাও হয়তো চাপা পড়ে যাবে নতুন নতুন কেস ফাইলের নিচে৷

সেদিন রাত্রে লুবনা যে সময়টাই খুন হয়েছিলো আজকেও সময়টা তার আশপাশেই হবে৷ বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে আছে সোহান সাহেব। নিঝুম অন্ধকারে মোড়ানো বাড়িটাতে কয়েকটায় মাত্র বাতি জ্বলছে। ঘন অন্ধকাটুকুর তাতে কোন ক্ষতিই হয়নি। উল্টো কেমন একটা অদ্ভূত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ির সামনের যেই ল্যাম্পপোস্ট তার বাতিটাও পিট পিট করে অন্ধকারের সাথে যেনো খেলা করছে। একবার জ্বলছে আবার নিভছে, নিভছে, জ্বলছে। রাস্তায় কয়েকটা কুকুর এদিক ওদিক দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে আর মাঝে মধ্যে তারস্বরে চিৎকার করে উঠছে। শুনে মনে হচ্ছে যেনো কান্না করছে।

বারান্দার কোন এক কোণের ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে মাঝে মাঝে গায়ে শিহরণ জাগানো বিড়ালের ম্যাঁও ম্যাঁও ডাক ভেসে আসছে। সবকিছু মিলে গা ছমছমে একটা পরিবেশ। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে আজ… ভয়ংকর কিছু একটা! সোহান সাহেবের একহাতে কফির কাপ আর একহাতে জ্বলন্ত সিগারেট কিন্তু সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই। কফি অনেকক্ষণ আগেই বরফ ঠান্ডা হয়েছে আর সিগারেট একা একাই নিজেকে পুড়িয়ে চলেছে। তিনি এখন অন্য দুনিয়ায়। তার মুখে মুচকি একটা হাসি ঝুলে আছে। লুবনা কে কত নৃশংস ভাবেই না খুন করেছেন ভাবতেই একটা অদ্ভূত রকমের আনন্দে ভরে উঠে তার মন। মানুষ খুন করাটা তার জন্য এখন একটা আর্ট হয়ে গেছে। মৃতপ্রায় মানুষের ভয়ানক কষ্ট আর আত্মচিৎকার অনেক আনন্দের জোগান দেয়। খুব রসিয়ে রসিয়ে, উপভোগ করে তিনি এখন এই কাজটা করেন।

লুবনা রুম থেকে বের হতেই ধারালো একটা ছুরি আর কিছুটা দড়ি হাতে তার পিছু পিছু রুম থেকে বের হয়ে আসেন সোহান সাহেব। বাগানে আসতেই ছুরিটা কোমরে গুঁজে পিছন থেকে আক্রমণ করেন লুবনাকে। এক ঝটকায় নিজের দিকে ফিরিয়ে একথাবায় আঁকড়ে ধরেন লুবনার চুলের মুঠি, সাথে অন্যহাতের প্রচন্ড এক চড়ে অর্ধেক অজ্ঞান বানিয়ে ফেলেন বেচারিকে। মেয়েটাকে কোলে করে তুলে নিয়ে গিয়ে বলতে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেন আম গাছটার গোড়ায়, তারপর শক্ত করে শেকড়ের সাথে হাত-পা বেঁধে ফেলেন, এমনকি মুখের মধ্যেও কাপড় ভরে দেন। লুবনার চাপা গোঙ্গানি অগ্রাহ্য করে জুতা পায়ে তার বুকে এলোপাথাড়ি লাথি দিতে থাকেন। সোহান সাহেবের কোন দিকে কোন খেয়াল নেই। তিনি যেনো মানুষ নয়, মানুষ রুপি হিংস্র জানোয়ারে পরিণত হয়েছেন, লুবনাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে চান৷ কোমরে গোঁজা ছুরিটা বের করে প্রথমে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকেন নিজের বউকে। আস্তে আস্তে ওর পেট কাটতে থাকেন, একের পর পোঁচ দিচ্ছিলেন আর চামড়া কেটে সাদা সাদা মাংস দেখা যাচ্ছিল৷ তারপর একে একে কাটতে শুরু করে বেচারির হাত-পা। কান-ঠোঁট কেটে নেওয়ার পর চিরে ফেলেন হতভাগীর পেট, সময় নিয়ে কেটে বের করে আনেন পেটের ভিতরের নাড়িভুঁড়ি কলিজাসহ তার কিডনি দুটো। তখনই ছটফট করতে থাকা লুবনা থেমে যায় একেবারে। চিরদিনের জন্য নিথর হয়ে যায় দেহটা। সব মজা শেষ। শেষে ছুরিব আরেকটা আঘাতে হা করে দিলেন গলাটা। মেয়েটার নগ্ন দেহটা পড়ে আছে । সারা শরীর থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। এক জোড়া ভয়ার্ত চোখ আকুতি নিয়ে এখনও চেয়ে আছে খুনিটার দিকে। বাঁচার জন্য বা অন্য কিছু বলার চেষ্টা করছে হয়তো মেয়েটা। সোহান সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লাশটা দেখছেন আর পাগলের মত নিজে নিজে হাসছে। আম গাছের নিচটা রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে।

সোহান সাহেব প্রথম খুনটা করেছিলেন তার বাবাকে। হ্যাঁ ঠিকিই শুনেছেন, জন্মদাতা পিতাই ছিলেন উনার প্রথম স্বীকার। গরীব ঘরের ছেলে উনি। ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট স্বীকার করে বেড়ে উঠেছেন। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে শুনে আসছেন বাবা মা পরস্পরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন কিন্তু কোনদিনই মায়ের প্রতি বাবার কোনপ্রকার ভালোবাসা উনার নজরে আসেনি। সারাদিন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন আর নেশার টাকার জন্য সহ বিভিন্ন ছোটখাটো কারণে মায়ের উপর অমানুষিক অত্যাচার করতেন। একমাত্র মায়ের একনিষ্ঠ চেষ্টাতেই উনাদের সংসারটা টিকে ছিলো। সারাদিন মানুষের বাড়িতে কাজ শেষে ফিরে এসে সারারাত সেলাই মেশিনে কাজ করে কোনরকমে সংসারটা টিকিয়ে রেখেছিলেন উনি, শুধুমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে। এমন আচরণে ধীরে ধীরে সোহান সাহেবের মনে বাবার প্রতি তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ জন্ম নেই। কাছে তো ভীড়তেনই না, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কথাও বলতেন না। এত ঝামেলার মধ্যেও একরকম ভাবে কেটে যাচ্ছিলো উনাদের জীবন৷

সোহান সাহেব মাত্রই মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পা রেখেছেন। একদিন কলেজ শেষ করে বাড়ি ফিরে যা দেখলেন তাতে উনার পৃথিবীটা উলটপালট হয়ে যায়। মা ডাবের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে আর ঘরের এককোনায় বসে বাবা নেশা করায় ব্যস্ত। এই দৃশ্য দেখে সোহান সাহেব সেদিন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নি। কাঁধের ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা ফিড়ি তুলে নিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে বাবার মাথায় আঘাত করেন৷ এক আঘাতেই উনার মাথা ফেটে দরদর করে রক্ত বের হয়ে আসে৷ উনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান। কিন্তু তাতেও সোহান সাহেবের ক্রোধ শান্ত হয় না। এদিক সেদিক তাকিয়ে হাতের কাছে কিছু না পেয়ে দৌঁড়ে গিয়ে রান্নাঘর থেকে বটি নিয়ে এসে বাবাকে কোপানো শুরু করেন৷ বাবা যে মারা গেছেন সে খেয়াল উনার নাই৷ ক্রোদ্ধন্মুক্ত হয়ে একের পর এক কোপাতেই থাকেন৷ অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ধপাস করে বাবার মৃত দেহের পাশেই বসে পড়েন৷ কিছুক্ষণ পর রাগ কিছুটা প্রশমিত হলে দড়ি খুঁজে এনে বাবাকেও মায়ের পাশে ঝুলিয়ে দিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান৷ সেদিন কেন জানি না বাবার ক্ষত-বিক্ষত লাশের দিকে তাকিয়ে খুব আনন্দ পেয়েছিলেন সোহান সাহেব। কিছু সময়ের জন্য মা হারানোর বেদনাটাও ভুলে গিয়েছিলেন।

পালিয়ে এসে অনেকদূর অন্য একটা শহরে নাম পরিচয় পাল্টে থাকতে শুরু করেন সোহান সাহেব। একটা ছোটখাটো হোটেলে ওয়েটারের চাকরির পাশাপাশি সেখানকার একটা কলেজে ভর্তি হোন। একা থাকতেই বেশি পছন্দ করতেন তিনি। বন্ধু বলতে একজনই ছিলো, রোহান৷ যেটুকু কথা বলতো, ঘুরতো সেটা ওই একজনের সাথেই। হঠাৎ একটি মেয়ে এসে উনার জীবন পুরোপুরি পাল্টে দেয়৷ অসাবধানতা বশত একদিন মেয়েটির সাথে সোহান সাহেবের ধাক্কা লেগে যায়। মেয়েটির নাম সোনিয়া। খুব বকেছিলো সোনিয়া উনাকে সেদিন। কিন্তু উনি কোন কথার জবাব না দিয়ে শুধু মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে ছিলেন। এরপর থেকে প্রতিদিনই সোনিয়া ছোট ছোট কারণে সোহান সাহেবকে বকা দিতে থাকে। এতে রাগ না করে উল্টো ধীরে ধীরে সোনিয়ার প্রতি দুর্বল হয়ে যান তিনি। এক সময় সম্পর্কটা ভালোবাসায় রুপ নেয়। শুরু হয় একসাথে পথচলা।

কিছু দিন যেতে না যেতেই সোনিয়া বদলে যেতে শুরু করে। সোহান সাহেবকে কেমন যেন দূরে ঠেলে দেয়। ফোন ফেসবুক কলেজ থেকে শুরু করে সব খানেই উনাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। শুরু হয় সোহান সাহেবের কষ্টময় জীবন। নিঃসঙ্গতা গ্রাস করে উনাকে৷ মানসিক দিক দিয়ে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। সোনিয়ার স্মৃতিগুলো শান্তিতে থাকতে দেই না। তীব্র আক্রোশের জন্ম হয় ভেতর ভেতর। বেশ কয়েকবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেও করেননি। ভেবেছেন, আমি কেন আত্মহত্যা করবো! আমার কি অপরাধ? যে অপরাধী তাকেই শাস্তি পেতে হবে। জেদের বসে একদিন মাঝ রাতে ঘুমন্ত সোনিয়াকে অজ্ঞান করে বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসেন চরম শাস্তি দেওয়ার জন্য।

সোনিয়াকে নিজের বাড়ি নিয়ে এসে খাটের সাথে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে মুখটাও শক্ত করে টেপ দিয়ে আঁটকে দেন৷ একহাতে ধারালো ছুরি আর একহাতে এসিড ভরা বোতল নিয়ে করতে থাকেন তার প্রেয়সীর জ্ঞান ফিরে আসার অপেক্ষা। জ্ঞান ফিরতেই নগ্ন অবস্থায় নিজেকে একটি অন্ধকার রুমে আবদ্ধ পায় সোনিয়া। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গেলে বুঝতে পারে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাথার উপর একটা কম পাওয়ারের লাইট ঝুলছে। মুখে জ্বলন্ত সিগারেট আর হাতে ছুরি ও বোতলের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে পাশেই কেউ একজন বসে আছে৷ অন্ধকারের করণে লোকটিকে ভাল করে দেখা যাচ্ছেনা। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সোনিয়া। কিছুক্ষণ পর আবারো জ্ঞান ফিরে আসতেই দেখে সামনে একটি চেয়ারে বসে আছে সোহান সাহেব। বুঝতে পারে এতক্ষণ জ্ঞান ফেরার অপেক্ষাতেই ছিলেন। এবার তার মনে ভয় দেখা দেয়, যা তার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারেন সোহান সাহেব।

প্রেয়সীর চোখের ভয় মাখানো দৃষ্টি দেখে আনন্দে ভরে উঠে সোহান সাহেবের মন৷ ভেবে পান না মানুষ কেন ধর্ষণ করে৷ ধর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি পৈশাচিক সুখ লুকিয়ে আছে মানুষকে কষ্ট দিয়ে তিলে তিলে মারার মধ্যে। তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মানুষ মেরে আশ্চর্য রকম আনন্দ পান সোহান সাহেব যা অন্য কোন কাজের মধ্যে পান না৷ এই কাজে ঘন্টার পর ঘন্টা খরছ করতেও উনার কোন আপত্তি নেই৷
হাতের এসিডের বোতল থেকে সোনিয়ার নগ্ন স্তনের উপর ফোঁটায় ফোঁটায় এসিড ফেলতে শুরু করলেন সোহান সাহেব। একভাবে এক জায়গাতেই এসিড ঢালার কারণে জায়গাটা পুড়ে গর্ত তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এসিড ঢালার পাশাপাশি হাতের ছুরি দিয়ে সেই গর্ত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আরো বড় করছেন তিনি৷ যন্ত্রনায় সোনিয়ার চোখ কোঠর ছেড়ে ছুঁটে বেরিয়ে আসার মত অবস্থা। আহ্, কি চমৎকার দৃশ্য৷

” ভয় পেয়ো না প্রেয়সী! একটুও ভয় পেয়েও না। এ তো মাত্র শুরু। তোমার জন্য আরো অনেক খাতিরযত্নের আয়োজন করে রেখেছি আমি। এখনই এত ভয় পেয়ে গেলে সেগুলো সহ্য করবে কিভাবে! ”
অনেক কিছু বলতে চায় সোনিয়া তার চোখ দেখেই সেটা অনুভব করতে পারছেন সোহান সাহেব। মুখ খুলে দিলেই এখন প্রাণ ভিক্ষার জন্য কাকুতি মিনতি শুরু করবে৷ এতে তার ডিস্টার্ব হবে৷ এখন তাকে কোন কথা বলার সুযোগ দিতে রাজি নন তিনি। অনেক বুঝিয়েছেন আর নয়, এখন শুধু শাস্তি৷ অনেকক্ষণ সময় নিয়ে এভাবেই সোনিয়ার সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এসিড ঢেলে ঝলসে দেন৷ তারপর একটা বড় সাইজের সুঁইয়ের একের পর এক খোঁচায় শরীরের বিভিন্ন জায়গা ক্ষত-বিক্ষত করেন। কোরবানির গরুর মত ছটফট করতে থাকে সোনিয়া। ছুরি দিয়ে জ্যান্ত সোনিয়ার চোখ দুইটা তুলে পাশের টেবিলের উপর রেখে বেশ কিছুক্ষণ সেটার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকেন।

চোখ দুটোর দিক থেকে প্রেয়সীর দিকে ফিরতেই দেখেন স্থীর হয়ে গেছে শরীরটা। যা বোঝার বুঝে নেন সোহান সাহেব। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ভয়ে, আতংকে স্ট্রোক করে মারা গেছে সোনিয়া। এত তাড়াতাড়িই প্রেয়সীর এই মৃত্যুতে কিছুটা মনক্ষুণ্ণ হোন তিনি৷ আরো অনেক কিছু প্লান করেছলেন তিনি প্রেয়সীকে নিয়ে। কিন্তু হয়ে উঠলো না। বিষন্ন মমে লাশটাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে চাপাতি দিয়ে মাংস কুটিকুটি করে কেটে সেগুলো একটা বড় লাগেজে ঢুকিয়ে কিছুদুরের নদিতে ছিটিয়ে ফেলে দিয়ে আসেন৷ বাড়ি ফিরে এসেই মন খুলে হাসতে থাকেন সোহান সাহেব৷ এবার অনেক শান্তি লাগছে তার।

সোনিয়াকে খুন করার পর থেকে সোহান সাহেব পুরোপুরি সাইকো হয়ে যান। পৃথিবীতে সবকিছুর বিচার হয় কিন্তু মন ভাঙ্গার কোন বিচার হয় না। তাই, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেই এই কাজটা তিনি নিজে হাতে করবেন৷ যাদের কাছে প্রেম ভালোবাসার কোন মূল্য নেই, ঠুনকো একটা বিষয়। যারা নিজেদের আরাম আয়েসের কথা চিন্তা করে প্রেম ভালোবাসা নিয়ে খেলা করে৷ খুঁজে খুঁজে তাদেরকে নিজে হাতে সর্বোচ্চ কষ্ট দিয়ে হত্যা করবেন তিনি৷ যেই ভাবা সেই কাজ। তারপর থেকে নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে সোহান সাহেব সেইসব মানুষগুলোকে খুন করতে শুরু করেন যাদের কাছে ভালোবাসা মাত্র একটা খেলার নাম৷

সোনিয়া মারা যাওয়ার পর সোহান সাহেবের কাছের মানুষ বলতে থাকে একমাত্র উনার বন্ধু রোহান। সেই রোহানকেও তিনি একদিন কষ্ট দিয়ে নিজ হাতে খুন করেন৷ রোহানকে তিনি অনেক ভালোবাসতেন কিন্তু তাই বলে তার অপরাধ ক্ষমা করে দিবেন সেটা তো কিছুতেই হতে পারে না। যদি ক্ষমা করে দিতেন তাহলে নিজেই সারাজীবন অপরাধী হয়ে থাকতেন৷ একটা মেয়ের সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে, তাকে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেয় রোহান৷ তারপর আবার সোহান সাহেবের কাছে এসে রসিয়ে রসিয়ে সেসব গল্প শোনায়৷ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে নি এটাই ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

একদিন রাতে রোহান এক আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য বের হলে জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে তাকে রাস্তা থেকে ডেকে বাড়ি নিয়ে আসেন সোহান সাহেব। এরকম একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন উনি। কারণ এখন ও নিঁখোজ হলে উনার দিকে কেউ আঙ্গুল তুলবে না। সবাই ওর আত্মীয়ের বাড়িতেই খোঁজ নিবে। যা ঝামেলা সব সেখানে হবে। নিজের বুদ্ধিতে নিজেই সন্তুষ্ট হয়ে মুচকি মুচকি হাসেন সোহান সাহেব। তারপর ওকে বাসায় এনে পরিকল্পনা মত চায়ের সাথে ঔষধ খাইয়ে ঘুম পড়িয়ে দেন৷
যখন ঘুম ভাঙ্গে ততক্ষণে একটা চেয়ারের সাথে বাঁধা পড়ে গেছে রোহান। মুখেও একটা কাপড় ঢোকানো। বাকরুদ্ধ অবস্থায় শুধু বড় বড় চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন সোহান সাহেবের দিকে৷ সোহান সাহেব হাসতে হাসতে বলেন _

” কি দরকার ছিলো ওই মেয়েটার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে ওর জীবনটা নরকে পরিণত করার? ভালো যখন বেসেছিলি তখন মন থেকে বাসতি। সারাজীবন মেয়েটার সাথ দিতি৷ অনেক বড় ভুল করেছিস তুই। এখন সেই ভুলের শাস্তি পাবি। তবে তুই আমার বন্ধু, মায়ের পরে তোকেই জীবনে সবচেয়ে কাছের ভেবেছি তাই আর সবার মত ওতটা কষ্ট দিয়ে মারবো না কিন্তু মরতে তোকে হবেই। ”

কথা শেষ করেই একটা হাতুড়ি দিয়ে পাগলের মত রোহানের মাথায় আঘাত করতে থাকেন। মাথা বার বার এদিক ওদিক নাড়িয়ে বাঁচার চেষ্টা করে রোহান কিন্তু তাতে তেমন কোন লাভ হয় না। অনবরত হাতুড়ির করুন আঘাতে চড়চড় আওয়াজ করে মাথার উপরের শক্ত হাড় ভেঙে যায়। গলা কাটা মুরগীর মত লাফাতে শুরু করে রোহান। বাহ্ কত সুন্দর দৃশ্য। ভেতরের হলুদ রঙের মগজের সাথে রক্ত মিশ্রিত হয়ে ছিটকে সোহান সাহেবের চোখে মুখে পড়ে৷ কিছুক্ষণ ছটফট করে চিরদিন এর জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় রোহান। মারা যায় সোহান সাহেবের প্রিয় বন্ধুটি। লাশটা কে চাপাতি দিয়ে টুকরা টুকরা করে কেটে বাগানের বিভিন্ন যায়গায় পুঁতে ফেলেন তিনি৷

তার সর্বশেষ শিকার ছিলো লুবনা। ফাইম নামের একটা ছেলের সাথে গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক ছিলো লুবনার। কিন্তু হঠাৎ ই একদিন কোন কারণ ছাড়াই ফাইমকে ছেড়ে দিয়ে অন্য একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায় লুবনা। অত্যন্ত সহজসরল একটা ছেলে ফাইম। এই ধাক্কা মেনে নিতে পারে না সে। পাগল হয়ে তার শেষ ঠিকানা হয় পাগলাগারদ। সবকিছু জেনে সোহান সাহেব সিদ্ধান্ত নেন লুবনাকে শাস্তি দেওয়ার। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও যখন মেয়েটাকে উনার জালে ফাঁসাতে ব্যর্থ হোন তখনই সিদ্ধান্ত নেন লুবনাকে বিয়ে করার। অবশেষে তিনি সফলভাবে কাজ শেষ করেছেন৷ লুবনাকে সর্বোচ্চ কষ্ট দিয়ে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন৷
সিগারেট পুড়ে শেষ হওয়ার ফলে হাতে ছ্যাঁকা অনুভব করাই ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসেন সোহান সাহেব। চেষ্টা করেন পুরনো সবকিছু ভুলে থাকার। কারণ তিনি জানেন এইসব কথা বেশি বেশি ভাবলে পাগল হতে তার বেশিদিন সময় লাগবে না। অবশ্য এতদিনে তিনি একজন প্রফেশনাল সিরিয়াল কিলারে পরিনত হয়েছেন৷ কোন প্রমাণ না রেখে প্রত্যেকটা খুন খুবই সূক্ষ্মভাবে করতে পারেন। পুলিশ এপর্যন্ত কোনদিনই তার নাগাল পায়নি। একজায়গায় দু-একটি খুন করে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই তিনি সেখান থেকে অনেকদূর কোথাও চলে যান। নতুন জায়গায়, নতুন পরিচয় নিয়ে জীবিকার জন্য এটা সেটা করেন আর নতুন নতুন স্বীকার খোঁজেন৷

লুবনাকে হত্যা করা তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেল। অথচ এখনো কোন হত্যার স্বাদ নিতে পারেননি সোহান সাহেব। বিষন্নতায় ভরে আছে উনার মন৷ লুবনার হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ একটু বেশিই মাতামাতি করেছে, চুপ থাকার এটা একটা কারণ। পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে শিকার হিসেবে নির্ধারিত করার পরে সঠিক সময় আর সঠিক জায়গার অভাবে তাদের হত্যা না করে এখনো চোখে চোখে রাখতে হয়েছে। কিন্তু আর নয়, এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে আর চলছে না সোহান সাহেবের। খুন করা যার নেশায় পরিণত হয়েছে কিভাবে চুপচাপ বসে থাকবেন আর। মনে হচ্ছে কতদিন যাবত অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন৷ নিজের প্রতিই নিজের বড্ড মায়া হচ্ছে। যেভাবেই হোক রক্ত তৃষ্ণা মিটানোর জন্য দ্রুত শিকার করতে হবে। কাজটা যে এখন খুব কঠিন হবে তা বোঝাই যাচ্ছে! তবুও যে শিকার করতেই হবে! ভাবতে ভাবতেই উনার ফোনের ভাইব্রেশন চালু হলে রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে একটা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা যায় –

” বস! আপনার অপেক্ষার পালা এবার শেষ হতে চলেছে। খবর নিয়ে জানতে পারলাম আমাদের একজন শিকার আজ বাড়িতে একা। খুব সহজেই তাকে পরপারে পাঠাতে চাইলে এখনই চলে আসুন। ”
” শিকার ” শব্দটা যেনো সোহান সাহেবের কানে মধু বর্ষণ করে। খুশিতে মনটা নেচে উঠে উনার৷ অনেকদিন পর আবার রক্ত নেশায় মেতে উঠার সময় এসেছে।
” চোখ রাখো, আমি আসছি! ”
( সমাপ্ত )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close