ভৌতিক গল্প

অন্তর্ধান_রহস্য ||শান্ত আকাশ

রাত তিনটা।
বাথরুমে বসে ধারালো চাপাতি আর রান্নাঘরের বটি দিয়ে পানি টলমল চোখ নিয়ে কাঁপা হাতে প্রানপ্রিয় স্ত্রী আর একমাত্র মেয়ে এশার লাশ টুকরো টুকরো করছে এশাদ। হাত চলছে না কিন্তু তারপরও রক্তমাংসের মেশিনের মত কাজটা করে যাচ্ছে। রাত শেষ হতে বেশি বাকি নেই কিন্তু কাজ এখনো অনেক বাকি।

কাটা শেষে লাশের টুকরোগুলো বস্তায় ভরে কয়েকবারে নিয়ে নিকটবর্তী নদীর বিভিন্ন জায়গায় ছিটিয়ে ফেলতে হবে। পুরো ঘরে ভালোভাবে কেরোসিন ছড়িয়ে আগুন লাগাতে হবে। আগুন এমনভাবে লাগা চায় যেনো মানুষ বুঝতে পেরে নেভানোর আগেই সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তারপর অন্ধকার থাকতেই এই এলাকার মায়া ত্যাগ করে অনেকদূরে কোথাও হারিয়ে যেতে হবে। সোজা কথা বাড়িতে তিনজন মানুষ ছিলো, তাদের কি হলো তার কোন চিহ্নই রাখবে না।
রাত বারোটা।

লোকাল থানার লকাপে এশাদ। তিনদিন আগে কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার করে এনেছে স্থানীয় পুলিশ। তারপর থেকে চলছে একের পর এক জেরা আর সাথে অমানুষিক নির্যাতন। উদ্দেশ্য, স্ত্রী কন্যার হদীস বের করা। কিন্তু এশাদ যেনো একটা জলজ্যান্ত পাথর, এত নির্যাতন সহ্য করেও টু শব্দ পর্যন্ত বের করেনি মুখ থেকে। সামনে বসে ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দায়িত্বরত অফিসার রায়হান।

” ওয়েল, ডিয়ার এশাদ সাহেব! তাহলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ খুলবেনই না। বিগত ছয়-ছয়টি বছর আমাদের কতটা প্যাড়ার মধ্যে রেখেছেন তার বিন্দুমাত্রও ধারণা আছে আপনার? জলজ্যান্ত তিনজন মানুষ রাতের অন্ধকারে হারিয়ে গেলো, মানে কি! কিভাবে সম্ভব? অমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। না কোন ক্লু, না অন্যকিছু। বাড়িটা পুড়ে শেষ কিন্তু ভেতরে লাশের কোন চিহ্ন নেই! কিভাবে মেনে নেই বলতে পারেন? সেই থেকেই চেষ্টায় আছি রহস্য উদঘাটনের।

কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না। আপনার চাচাতো ভাই কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে আপনাকে দেখে আমাদের না জানালে তো এই কেস সারাজীবন রহস্যই থাকতো। এখন দয়া করে মুখটা খুলুন। এই নীরবতা সহ্য করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। ”

যাকে উদ্দেশ্যে করে এত কথা সেই এশাদের এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যাথাই নেই। নীরব দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে আছে অফিসারের দিকে।
” এশাদ সাহেব প্লিজ! আর চুপ করে থাকবেন না। রায়হানের হাতে পড়েছে অথচ আসামী মুখ খোলেনি এমন ঘটনা এই প্রথম। আপনি আসলে কি দিয়ে তৈরী? মানুষ তো! নাকি অন্যকিছু? এই নিরবতা আমাকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। আগেও অনেক আসামী আমার হাতে সাইজ হয়েছে কিন্তু কারো জন্য কোনরকম অনুশোচনা অনুভব করিনি কখনো।

কিন্তু আপনার নীরবতা আমাকে ঠেকিয়ে দিচ্ছে! চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। ভেতর থেকে বার বার বলছে, নীরবতার পিছনে বড় কোন কাহিনী লুকিয়ে আছে। আপনার নীরবতা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, ঘুমাতে দিচ্ছে না। সেজন্যই এই মাঝরাতে আপনার সামনে বসে। আমাকে জানতেই হবে আসলে কি হয়েছিল সেদিন? সত্যি বলতে, আমার জীবনে ……..”

” সেদিন ছিলো শুক্রবার… ”
রায়হানের কথার মাঝখানে হঠাৎ আপন মনেই কথা বলে উঠে এশাদ।
শুক্রবার মানেই আমাদের কাছে স্পেশাল। কর্মব্যস্ত জীবনে সপ্তাহের ওই একটা দিন পরিবার নিয়ে একটু ঘোরাঘুরি, আনন্দ করতাম। সেদিন ঘুরতে গিয়েছিলাম পদ্মার তীরে। শুক্রবার মানেই সেখানে উৎসবমুখর, আনন্দঘন পরিবেশ। লোকে লোকারণ্য পদ্মার তীর। শুধু যে এলাকার মানুষ তা কিন্তু নয়, অনেক দুর দুরান্ত থেকে মানুষ এসে ভীড় জমায় নদী পাড়ের নির্মল পরিবেশ উপভোগ করতে। স্ত্রী আয়েশা আর একমাত্র মেয়ে এশা কে নিয়ে নদীর পাড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ মেয়েটার আবদার-

” আব্বু? আইসক্রিম খাবো। ”
” আইসক্রিম নিতে হলে যে উপরে যেতে হবে মামুনি, সে তো এখান থেকে বেশ দূরে। যাওয়ার সময় নেব, বাসায় গিয়ে খাবে, কেমন? ”
” না বাবা, কোন কথা শুনছি না। আমি এক্ষুনি খাবো। নদীর পাড়ে বসে আইসক্রিম খাওয়ার মজাটা তুমি বুঝবে না। নিয়েই তো আসো আগে, তারপর দেখবে কত্ত মজা! ”

মেয়র সাথে এবার আয়েশাও যোগ দেয়,
” আরে যাও না। মেয়েটা যখন এত করে বলছে নদীর পাড়ে বসে আইসক্রিম খাবে। অল্পই তো রাস্তা, এত অলস তুমি কবে থেকে হলে এশাদ! ”
” আরিব্বাস, মেয়ের মায়েরও দেখি আইসক্রিম খাওয়ার লোভ জেগেছে মনে! ”
” আরে নাগো, সেটা না। মেয়েটা বার বার বলছে নদীর পাড়ে বসে আইসক্রিম খাবে সেজন্যই বললাম। অবশ্য আমারও মন্দ লাগবে না! এখন যাও তো নিয়ে এস, আর কথা বাড়িও না। ”

” হলো তো বাবা! এখন মামুনিরও এটাই ইচ্ছে। তাড়াতাড়ি যাও এবার, নিয়ে এসো আইসক্রিম। ”
” যাচ্ছি রে মা যাচ্ছি! না গিয়ে আর উপায়ই বা কই? যেখানে প্রিন্সেস আর মহারানী একদিকে সেখানে তাদের রাজ্যের সামান্য এক গরীব প্রজার কি-ই বা করার থাকতে পারে! তোমারাই এখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, কথা না শুনলে দেখা যাবে শেষমেশ এই হাজবেন্ডের চাকরীটায় হারাবো! ”

” ধুত্তোর এশাদ, সবসময় ফাজলামো করার স্বাভাবটা তোমার আর গেলো না। গেলে এখান থেকে! ”
আয়েশা কে নড়ে উঠতে দেখেই বুঝলাম আক্রমণ সন্নিকটে। চুল ধরে টানাটানি করাটা ওর খুব পছন্দ, সুযোগ পেলেই আমার সুন্দর চুলগুলোর পেছনে লাগে। একবার ধরতে পারলে খবর আছে তাই লাফিয়ে উঠে দোকানের দিকে দৌঁড় দিলাম।
আইসক্রিম হাতে নিয়ে ঢাল থেকে নামতেই ভেতরটা কেঁপে উঠলো। তিনজন লোক আয়েশা আর এশা কে ঘিরে ধরেছে। আপনা আপনি হাঁটার গতি বেড়ে গেলো।

একটু কাছাকাছি হতেই দেখলাম শুধু ঘিরেই ধরেছে তা নয়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় স্পর্শ করছে সাথে অনেক অশ্লীল মন্তব্য করছে ওদের উদ্দেশ্যে। বাচ্চা মেয়েটাকেও ছাড় দিচ্ছে না জানোয়ারগুলো। এই দৃশ্য দেখে মাথায় খুন চেপে গেলো। নিজেকে বদ্ধ উন্মাদ মনে হচ্ছিলো। এদিক ওদিক তাকাতেই একটা বাঁশের টুকরো চোখে পড়লো। আইসক্রিম ফেলে সেটা তুলে নিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে লোকগুলিকে এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করলাম। ওরা খালি হাত। আমার সাথে পেরে উঠলো না। এক পর্যায়ে দৌঁড়ে পালানো। যাওয়ার সময় বলে গেলো-

” আমাদের গায়ে হাত দিয়ে মোটেই ভালো করলি না। কথা দিচ্ছি, এর জন্য তোদের চরম ভোগা ভুগতে হবে। ”
ওখানে আর এক মুহুর্ত না থেকে সাথে সাথে বাড়ি চলে আসি। সন্ধ্যার আগেই নিরাপদে ওদের নিয়ে বাড়ি পৌঁছায়। চেষ্টা করছিলাম চিন্তাভাবনা স্বাভাবিক রাখার কিন্তু পারছিলাম না।

মনে একটা অস্বস্তি কাজ করছিলো। অশুভ চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো মাথায়। চলে যাওয়ার সময় বলা ওই লোকের কথাগুলো কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। এতটাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বললো যেনো কিছু একটা করবেই। চিন্তায় আছি এটা আয়েশা কে বুঝতে দিলাম না। কারণ তাতে অযথায় ওর চিন্তা বাড়বে। সেই সন্ধ্যা থেকেই আবার গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ছাড়ার নাম নেই। বিরক্তিকর ব্যাপার! শরীর খারাপের অযুহাত দিয়ে রাতে নামমাত্র কিছু চালান করে ঘুমাতে গেলাম।

তিনজন এক রুমেই ঘুমায়, মেয়েটা বাবা ছাড়া ঘুমাতে পারে না। বিভিন্ন রকম আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলাম দরজা ধাক্কার শব্দে! ধাক্কাচ্ছে আর ডাকছে কেউ –
” বাড়িতে কে আছেন? দরজাটা খুলুন দয়া করে, আমার একটু সাহায্য দরকার। খুব জরুরী! খুলুন দয়া করে! ”

এশাদ জানতে চাই –
” কে আপনি? এত রাতে কি সমস্যা হয়েছে? কি ধরনের সাহায্য চান? ”
” পরের পাড়াতেই আমার বাড়ি, বন্ধুকে নিয়ে শহরে গিয়েছিলাম একটা কাজে। বৃষ্টির কারণে ফিরতে দেরি। পিচ্ছিল হয়ে আছে রাস্তা, স্লিপ করে মোটরসাইকেল পড়ে গেছে। আমার আঘাত সামান্য কিন্তু বন্ধুর অবস্থা মারাত্মক। একটু সাহায্য করলে খুব উপকার হতো। চির ঋণী হয়ে থকবো। ”

একজন বিপদে পড়েছে, এই সময় যদি তার পাশে না দাঁড়ায় তাহলে কিসের মানুষ আমি! সবকিছু ভুলে তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুললাম। খুলতেই দেখি একটা পিস্তল সোজা আমার কপাল বরাবর তাক করা। পিস্তলের পেছনে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে সেই হুমকি দেওয়া লোকটা। সাথে আরো কিছু লোক। পিস্তল হাতে লোকটাকেই ওদের নেতা মনে হলো। অপমানের শোধ নিতে এসেছে। তীব্র আতঙ্কে ভেতরটা শিউরে উঠলো।

চেষ্টা করলাম দরজা বন্ধ করার। কিন্তু সুযোগ দিল না ওরা। এক ধাক্কায় আমাকে সরিয়ে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পিস্তলের মুখে আমাকে একটা চেয়ারের সাথে বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে দিলো। একজন গিয়ে দরজাটা আঁটকে দিলো। এদিকে আমার দেরি দেখে শোয়ার ঘর থেকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ডেকে যাচ্ছে আয়েশা।

” কি গো? গেলে তো গেলেই, আসার কোন নাম গন্ধই যে নেই, ব্যাপার খানা কি শুনি তো! প্রাক্তন কোন প্রেমিকা চলে এসেছে বুঝি এই মাঝরাত্রে! তাকে পেয়ে আমাকে ভুলেই গেলে! তাড়াতাড়ি আসো তো, না হলে কিন্তু সত্যি সত্যি তোমার হাজবেন্ডের চাকরিটা খেয়ে দেবো। ”

আয়েশার এভাবে ডাকা দেখে শয়তানগুলো একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। দারুণ মজা পাচ্ছে। একজন বললো –
” ভাইলোক, অযথা কেন দেরি করছি! আমার দেরি সহ্য হচ্ছে না। চল, ওই ঘরে গিয়ে ধরি মালটাকে! ”
নেতা লোকটা মৃদুস্বরে ধমক দিলো-
” আরে থাম, এত অস্থির কেন? সব তো এখন আমাদেরই। দেখি না স্বামীটাকে না পেয়ে কি করে মালটা! ”
আমার ভেতরটা তোলপাড় করছে। কিভাবে বাঁচা যায় এদের হাত থেকে কিছুই বুঝে আসছে না।
বেশ কয়েকবার ডাকার পরেও সাড়া না পেয়ে আয়েশা এই ঘরে চলে এলো আমার খোঁজে। ঘরে ঢুকেই লোকগুলোকে দেখে থমকে গেলো, স্পষ্ট দেখলাম নগ্ন ভয় খেলে গেলো ওর চোখে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। আয়েশা কে ঘরে ঢুকতে দেখেই নেতাটা আমার দিকে পিস্তল তাক করলো।

” একটা টু শব্দ করলেই তোর স্বামীকে ঠুশ। ”
বলেই হেসে উঠলো।
” সেদিন তো খুব হিরোগিরী দেখালো! আজকে দেখি কিভাবে বাঁচায় তোকে! ”
আয়েশাকে দেখছে ওরা। পা থেকে মাথা পর্যন্ত নজর বোলাচ্ছে। এমন দৃষ্টিতে দেখছে, মানে বুঝতে কষ্ট হয় না কারোরই। চোখ দিয়েই যেনো চেটেপুটে খেয়ে ফেলছে। গা রি রি করে উঠলো আমার। মানুষের দৃষ্টিও এত খারাপ হতে পারে কখনো কল্পনাও করিনি।
নেতা বলে উঠলো –

” শুধু দেখলেই মনের খায়েশ মিটবে! খুব তো অস্থির হয়ে গেলি, এখন চুপ কেন? যা, ধরে নিয়ে আয়। নবাবের বেটি, একটা যদি টু শব্দ করিস ধরে নিবি তোর স্বামী মৃত! ”
” আরেহ ওস্তাদ, এত চিন্তা কইরেন না। বাইরে যে হারে বৃষ্টি হইতাছে তাতে মাগী গলা ফাডাইলেও কেউ শুনতে পাইবো না। ”
বলতে বলতে একজন গিয়ে আয়েশা কে জড়িয়ে ধরলো।

অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আয়েশা। কি করবো আমি জানি না। চেয়ারের সাথে আষ্টেপৃষ্টে হাত-পা বাঁধা। অনেক চেষ্টা করেও বাঁধন ঢিল করতে পারিনি। পাকা হাতের বাঁধন। যত চেষ্টা করছি মাংস কেটে দঁড়ি বসে যাচ্ছে। রক্তান্ত হয়ে গেছে হাত। আয়েশা ধস্তাধস্তি শুরু করলো লোকটার সাথে। তাই দেখে হেসে উঠলো নেতা লোকটা।
” মেয়েদের সবচেয়ে দামী তার ইজ্জত, যদিও স্বামী মৃত্যুর মুখে তারপরও এত সহজে কেন সেটা দেবে? তোরা দাঁড়িয়ে কি দেখছিস হারামজাদারা! যা ধর সবাই মিলে। ”

সবাই যেনো এই অপেক্ষাতেই ছিলো। নির্দেশ পাওয়ার মাত্রই ক্ষুধার্ত হায়েনার মত হামলে পড়লো আয়েশার ওপর। আমার চোখের সামনে সবাই মিলে ওকে ভোগ করলো। অসহায় দৃষ্টিতে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না আমি।
হঠাৎ-ই একজন বললো –
” বস মেয়েটাও কিন্তু সেই একটা জিনিস! ”
বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠলো। চিৎকার করে বললাম –
” রহম কর, দয়া করে একটু রহম কর। বাচ্চা মেয়েটার গায়ে তোরা হাত দিস না। ”
মুখ বাঁধা থাকায় গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা গেলো না।

ডুকরে কেঁদে উঠলো এশাদ। অনেকক্ষণ অঝোর ধারায় চোখের পানি ছেড়ে কাঁদলো। রায়হান বাঁধা দিলেন না। অনেক দিনের বুকে জমানো কষ্টগুলো চোখের পানি হয়ে কিছুটা হলেও ঝরে যাক।
” ছাড়লো না স্যার, আমার বাচ্চা মেয়েটার ওপরে কোন দয়া হলো না জানোয়ার গুলোর। বাচ্চা মেয়েটা আমার! ঘটনার দুদিন আগেই নবম জন্মদিন পালন করলাম। হায়েনাগুলো মেয়েটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেলো কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমার চোখের সামনেই তড়পাতে তড়পাতে মারা গেলো মেয়েটা। এগুলো দেখার পরেও আমি কিভাবে এখনো বেঁচে আছি নিজেই ভেবে অবাক হই! ”

যে রায়হান চরম নিষ্ঠুরতার সাথে আসামিদের উপর নির্যাতন চালিয়েও কখনো কোন দুঃখ অনুভব করেনি, এশাদের নিষ্ঠুরতম কাহিনী শুনে তার চোখও পানিতে টলমল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলেন তিনি।
” আপনার স্ত্রী? উনি তো বেঁচে ছিলেন? কোথায় এখন তিনি? আর আপনার মেয়ের লাশটাই বা কোথায় গেলো? ”
অঝোর ধারায় এখনো পড়ছে এশাদের চোখের পানি।

” আমার স্ত্রী স্যার! ও জ্ঞান হারিয়েছিলো। শয়তানগুলো চলে যাওয়া পর জ্ঞান ফিরলে আমাকে বাঁধন মুক্ত করে। অজ্ঞান হওয়ায় ভালো হয়েছিলো। মেয়েটার উপর নৃশংসতা ওকে দেখতে হয়নি। তবে জ্ঞান ফেরার পর মেয়ের রক্তাক্ত লাশ দেখে কি ঘটেছে বুঝে ও পাথর হয়ে যায়। আমার কাছে একটা অনুরোধ করে এবং সেটাই ছিলো ওর শেষ ইচ্ছে। ”
” কি অনুরোধ ছিলো সেটা? ”

” আয়েশা চায়নি এই ঘটনা জানাজানি হোক, চায়নি মেয়েটার লাশ নিয়ে টানাটানি বা কাটাছেঁড়া হোক। চায়নি লোকে ওকে দেখলেই ছি ছি করুক। আমাকে পুলিশের কাছেও যেতে দেইনি কারণ দেশের আইন ব্যাবস্থার উপর ওর বিন্দুমাত্র ভরসা ছিলো না। পূর্ণ বিশ্বাস ছিলো আইনের আশ্রয় নিলে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সারাজীবন পার হয়ে যাবে কিন্তু ওই ক্ষমতাসীন লোকদের কোন বিচার হবে না। আমার পা জড়িয়ে ধরে বলেছিলো আমি যেনো ওকে নিজে হাতে খুন করে লাশ দুইটা গুম করে ফেলি তারপর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে এই এলাকা ছেড়ে অনেকদূর কোথাও চলে যাই। যাতে কেউ যেনো কোনদিন বুঝতে না পারে আমাদের কি হয়েছে। এটা যেনো সারাজীবন রহস্যই থেকে যায়। এমনকি আমি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছি, সেটাতেও রাজি হয়নি। ও চাইনি আমার অবস্থাও ওদের মতই হোক। চেয়েছিলো আমি বেঁচে থাকি আর আমার মাঝে বেঁচে থাকুক ও নিজে, আমাদের সন্তান, বেঁচে থাকুক আমাদের ভালোবাসা। এজন্যই এত কষ্ট বুকে নিয়ে এখনো বেঁচে আছি। আমার আয়েশাকে নিজ হাতে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছি স্যার! ”

” আপনাকে আমি কোন দোষ দেবো না। যা করেছেন স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই করেছেন। কিন্তু এশাদ সাহেব! এই মিথ্যার দুনিয়ায় এখনো কিছু ভালো মানুষ আছে। অসৎ এর ভীড়ে প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে এখনো কিছু সৎ মানুষ আছে। তা না হলে দুনিয়ার ভালো খারাপের সামঞ্জস্যতা কবেই নষ্ট হয়ে দুনিয়া ধ্বংস হতো। যত ক্ষমতাসীন হোক, কেউ নিয়মের বাইরে নয়। আপনার স্ত্রী-কন্যার ধর্ষণকারীরা শাস্তি অবশ্যই পাবে এবং সে ব্যবস্থা আমি করবো। ”

” কিন্তু স্যার আমার স্ত্রীর….. ”
” আপনার স্ত্রীর শেষ ইচ্ছের কথা ভাবছেন তো? সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না। অপরাধীরা শাস্তি পাবে এবং সর্বোচ্চ শাস্তিটাই পাবে কিন্তু হবে না কোন কেস, হবে না কোন আইন-আদালত। শাস্তিটা আমি নিজে দেবো এবং সেটাও আপনার হাত দিয়ে! ”
অফিসার রায়হানের কথা শুনে ছয় বছরের মধ্যে এই প্রথম এশাদের মুখে হাসি ফুটে উঠে।
(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close